বিকালটা পুরোপুরি গলে যায়নি। রোদের মিটে খেলা চলছে। যেনো না থামার শখ। বুদাপেস্টের বাতাস দূর বন্ধুর মতো পাশ ঘিরে ধরেছে সাদুনের। মনে পড়ছে বেনইয়ামিন বন্ধুর কথা। দানিয়ুব নদীতে ইউরোপের ছল ছল খেলা উতলাচ্ছে সাদুনের ঢাকার কথাগুলো!

কতগুলো বছর গিয়েছে তবে সুদীর্ঘ সময় নয়। শুরু থেকে শখ ছিলো মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে ক্যারিয়ার বানানোর। সে চ্যালেঞ্জও নিয়েছিলো সাদুন।

রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ঢাকা, জাহাঙ্গীনগর, বুয়েটসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়েছে সে কিন্তু ফলটা তখনো অনুকূলে আসেনি। সঙ্গে কানকথা। সমাজের মুখগুলোর সেই দর্শকমুখো আচরণ। জিতলে বাহ বাহ বাহ আর না পারার কষ্টটা যেন যে পারেনা শুধু তারই।

শুনি সে কথাই সাদুন মাহমুদের থেকে-“বড়ভাই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। এতোটাকা খরচ করে পড়ার সুযোগ আমার ছিলোনা। সব কিছু নিয়ে যখন চিন্তার নয়-ছয় চলছিলো তখন পরিচিত এক ভাইয়ের মাধ্যমে এফআইসিসির খোঁজ পেলাম। তারপরের গল্পটা ভিন্নই ছিলো।”

সাদুন আর বেনইয়ামিন দু’জনই ছিলো মানিকজোড়। পরিকল্পনা নিলো একসঙ্গে চায়না পড়তে যাবে স্কলারশিপ নিয়ে, দুজন একসঙ্গে পড়বে। এনিয়ে তাদের এফআইসিসিতে আসা-যাওয়া।

প্রতিষ্ঠানের কনাসলটেন্ট ভাইয়েরা জানালেন আইএলটিএসে ভালো স্কোর দিতে পারলে ফুলফান্ড স্কলারশিপের সুবিধা সহজ হবে। তার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। সব সহযোগিতা এখান থেকেই দেয়া হবে।

এ প্রসঙ্গে সাদুনের কথা হলো-“দুজনই এফআইসিসির তত্ত্বাবধানে আইএলটিএসের প্রস্তুতি নিলাম। কোর্সের ব্যাপারে ভাইয়াদের সহযোগিতাটা ভিন্ন ছিল তা সহজভাবেই স্বীকার করছি। যেটা এ প্রতিষ্ঠানের বড় উদারতা সেটা হলো তারা আমাদের ক্লায়েন্ট ভাবেনি পরিবারের একজন হিসেবে সবসময় সঙ্গ দিয়েছে।”

আইএলটিএসে সাদুনের স্কোর ছিলো ৭.৫ আর বন্ধুরটা ৭.০। একসঙ্গে আবেদন করা হয়েছিলো চায়না আর হাঙ্গেরি স্কলারশিপের জন্য। সে পরিকল্পনামতোই মৌখিক আর লিখিত পরীক্ষার দুটো চ্যালেঞ্জ পারি দিতে হয় সাদুনকে। ফলটা এবার আর তাকে হতাশ করেনি। হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের নামকরা —বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ম্যাকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ ফুল ফান্ড স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে যাবার সুযোগ আসে তার।
তারপর ঢাকাকে পাখির চোখে দেখার সুযোগ আসে সাদুনের। শুরু হলো রাজ্য জয়ের যাত্রা। স্বপ্নের পিছনে উড়ার যাত্রা।

নিজের এ আনন্দে এফআইসিসিকে বাহবা দিতে ভুলেনি সাদুন। তার ভাষায়-“এফআইসিসি আমাকে সাহস আর অনুপ্রেরণা দিয়েছে। দেশে কোথাও চান্স না পেলে যে লড়াই থেমে যায়না সেটা সেখানে গিয়ে বুঝেছি। আজ আমি পাবলিকে চান্স না পেলেও বাইরে পড়তে যাচ্ছি পছন্দ আর টার্গেটের বিষয় নিয়েই। ভারতে ভিসার জন্য যেকয়দিন গিয়েছি তার পুরোটা খরচ দিয়েছে এফআইসিসি। এমনকি কষ্ট হবে সে চিন্তা করে ট্রেনে না পাঠিয়ে আমাকে পাঠানো হয় প্লেনে। এ আন্তরিকতা ভুলে যাবার জিনিস নয়।”

সাদুনের কথা হলো স্বপ্ন বরফ জমা কিছু নয়। খুঁজে নিতে হয়। বুদাপেস্ট আর দানিয়ুব নদীর কোল ঘেঁষে সে এখন স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছে। ইউরোপের রুপসী নদীতে তখন বিকালে ঝিকিমিকির স্মৃতি ছল ছল খেলা। বুড়িগঙ্গার কথা ভাবছে সাদুন। ভাবছে হাসির গল্প বুনে দেশে ফিরবে একদিন।